Ticker

6/recent/ticker-posts

পবিত্রারোপিণী একাদশীর মাহাত্ম্য The Significance of Pavitraropini Ekadashi Mahatmo

 

পবিত্রারোপিণী একাদশীর মাহাত্ম্য The Significance of Pavitraropini Ekadashi Mahatmo

একদিন মহারাজ যুধিষ্ঠির ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে প্রভু! শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের একাদশীর নাম কী? অনুগ্রহ করে এর মাহাত্ম্য আমাকে বলুন।”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন, “হে মহারাজ! এখন আমি সেই পবিত্র একাদশী ব্রতের মাহাত্ম্য বর্ণনা করছি। এই কাহিনি শ্রবণ করলে বাজপেয় যজ্ঞ সম্পাদনের সমান পুণ্য লাভ হয়। তাই একাগ্রচিত্তে শুনুন।

প্রাচীনকালে, দ্বাপর যুগের সূচনালগ্নে মহিজীৎ নামে এক পরাক্রমশালী ও প্রসিদ্ধ রাজা ছিলেন। তিনি মাহিষ্মতী নগর শাসন করতেন। রাজ্য, ঐশ্বর্য ও প্রজাসুখ—সবকিছু থাকা সত্ত্বেও তাঁর মনে কোনো শান্তি ছিল না। কারণ, তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। পুত্রসন্তান না থাকায় তিনি নিজেকে অত্যন্ত দুর্ভাগা মনে করতেন এবং সর্বদা গভীর চিন্তায় নিমগ্ন থাকতেন।

একদিন তিনি ব্রাহ্মণ ও সভাসদদের উদ্দেশে বললেন, “হে ব্রাহ্মণগণ ও প্রজাবৃন্দ! তোমরা আমার কথা শোন। আমি এই জীবনে কোনো পাপ করিনি, অন্যায়ভাবে রাজকোষ বৃদ্ধি করিনি, কখনও ব্রাহ্মণ বা দেবতাদের সম্পদ আত্মসাৎ করিনি। বরং প্রজাদের আপন সন্তানের মতো স্নেহ ও যত্নে পালন করেছি। ধর্মনীতি অনুসারে রাজ্য শাসন করেছি, অপরাধীদের যথাযথ শাস্তি দিয়েছি এবং সজ্জনদের সর্বদা সম্মান করেছি। তবুও কেন আমি পুত্রসন্তান লাভ থেকে বঞ্চিত হলাম? আপনারা অনুগ্রহ করে এর কারণ অনুসন্ধান করুন।”

রাজার হৃদয়বিদারক বক্তব্য শুনে রাজপুরোহিত ও ব্রাহ্মণগণ অত্যন্ত মর্মাহত হলেন। তাঁরা রাজার মঙ্গল কামনায় গভীর অরণ্যে ত্রিকালজ্ঞ এক মহর্ষির শরণাপন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

বনের মধ্যে বিভিন্ন ঋষির আশ্রম অতিক্রম করতে করতে তাঁরা এক মহাতপস্বীর দর্শন পেলেন। তিনি দীর্ঘায়ু, নিরোগ ও কঠোর তপস্যায় নিমগ্ন ছিলেন। সর্বশাস্ত্রবিশারদ, ধর্মতত্ত্বজ্ঞ ও ত্রিকালদর্শী সেই মহান ঋষির নাম ছিল লোমশ মুনি। বলা হয়, ব্রহ্মার এক একটি কল্প অতিবাহিত হলে তাঁর দেহ থেকে মাত্র একটি লোম ঝরে পড়ত। এই কারণেই তিনি ‘লোমশ’ নামে পরিচিত হন।

ঋষিকে দর্শন করে ব্রাহ্মণগণ নিজেদের ধন্য মনে করলেন। তাঁরা পরস্পর বলতে লাগলেন, “অসংখ্য জন্মের পুণ্যের ফলেই আজ আমরা এই মহামুনির দর্শন লাভ করেছি।”

তখন লোমশ মুনি তাঁদের উদ্দেশে বললেন, “আপনারা কী উদ্দেশ্যে এখানে এসেছেন? কেনই বা আমার এত প্রশংসা করছেন? নির্দ্বিধায় সব কথা বলুন। আপনাদের কল্যাণে যা সম্ভব, আমি অবশ্যই তা করব।”

ব্রাহ্মণগণ বিনয়ের সঙ্গে বললেন, “হে ঋষিবর! আপনার কৃপা প্রার্থনা করছি। মহিজীৎ নামে আমাদের এক ধর্মপরায়ণ রাজা আছেন। তিনি নিঃসন্তান হওয়ায় গভীর দুঃখে দিন কাটাচ্ছেন। তিনি আমাদের পুত্রসম স্নেহে লালন-পালন করেন, তাই তাঁর দুঃখ আমাদেরও দুঃখ। তাঁর পুত্রলাভের কোনো উপায় আছে কি না, দয়া করে আমাদের জানান।”

তাঁদের কথা শুনে লোমশ মুনি গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হলেন। কিছুক্ষণ পরে তিনি দিব্যদৃষ্টিতে রাজার পূর্বজন্মের ঘটনা অবলোকন করে বলতে শুরু করলেন—

“পূর্বজন্মে এই রাজা এক দরিদ্র বৈশ্য ছিলেন। জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ব্যবসা করতেন। একদিন জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের দশমী তিথিতে পথে চলার সময় তিনি প্রবল তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়েন। গ্রামসংলগ্ন একটি জলাশয় দেখে তিনি সেখানে জলপান করতে যান। সেই সময় একটি গাভী ও তার বাছুর জল পান করছিল। কিন্তু তিনি তাদের সেখান থেকে তাড়িয়ে দিয়ে নিজেই আগে জল পান করেন।

এই নিষ্ঠুর ও অধার্মিক আচরণের ফলেই তিনি বর্তমান জন্মে পুত্রসুখ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তবে পূর্বজন্মে সঞ্চিত অন্যান্য পুণ্যের প্রভাবে তিনি এই জীবনে এক সমৃদ্ধ, শান্তিপূর্ণ ও নিষ্কণ্টক রাজ্যের অধিপতি হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ