Ticker

6/recent/ticker-posts

শ্রীকৃষ্ণের চৌষট্টি দিব্য গুণাবলী। Hare Krishna

 


🌿 শ্রীকৃষ্ণের চৌষট্টি দিব্য গুণাবলী 🌿

শ্রীল রূপ গোস্বামীপাদ প্রণীত ভক্তিরসামৃতসিন্ধু এবং শ্রীল জীব গোস্বামীপাদ প্রণীত ভক্তিসন্দর্ভ প্রভৃতি বৈষ্ণব গ্রন্থের আলোকে

শ্রীকৃষ্ণের স্বরূপ মূলত দুই প্রকার—আচ্ছাদিত এবং প্রকট। যখন তিনি নানাবিধ বেশভূষা ধারণ করে লীলাবিলাস করেন, তখন তাঁর স্বরূপ আচ্ছাদিত থাকে। এর একটি মনোরম উদাহরণ পাওয়া যায় শ্রীমদ্ভাগবতের দ্বারকা-লীলায়। এক সময় শ্রীকৃষ্ণ স্ত্রীবেশ ধারণ করে লীলা করছিলেন। সেই রূপ দর্শন করে উদ্ধব বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন—"আহা! কী আশ্চর্য! শ্রীকৃষ্ণ যেমন ভক্তিরসে আমার হৃদয়কে দ্রবীভূত করে আমাকে আকর্ষণ করেন, এই রমণীও ঠিক তেমনি আমাকে আকর্ষণ করছে। নিশ্চয়ই শ্রীকৃষ্ণই স্ত্রীরূপ ধারণ করেছেন।"

অন্যদিকে, শ্রীকৃষ্ণের প্রকট স্বরূপ দর্শন করে এক ভক্ত তাঁর রূপমাধুর্যের স্তব করতে গিয়ে বলেন—"ভগবান শ্রীকৃষ্ণের রূপ অপরূপ মাধুর্যময়। তাঁর গ্রীবা শঙ্খের ন্যায় সুশোভিত, চক্ষুযুগল এমন মনোমুগ্ধকর যে, তাদের সামনে পদ্মফুলের সৌন্দর্যও ম্লান হয়ে যায়। তাঁর তমালসম ঘনশ্যাম দেহ, কুঞ্চিত কেশে শোভিত মস্তক এবং বক্ষে শ্রীবৎসচিহ্ন তাঁর সৌন্দর্যকে আরও অপরূপ করে তুলেছে। তাঁর সমগ্র রূপ ভক্তদের হৃদয়কে মোহিত করে। এইভাবেই মধুসূদন তাঁর দিব্য গুণাবলী প্রকাশ করে সমগ্র জগতকে দিব্য আনন্দে পরিপূর্ণ করেন।"

শ্রীল রূপ গোস্বামীপাদ বিভিন্ন বৈদিক শাস্ত্র বিচার করে শ্রীকৃষ্ণের প্রথম পঞ্চাশটি গুণ উল্লেখ করেছেন। সেগুলি হলো—

১) অপূর্ব মাধুর্যমণ্ডিত দেহ, ২) সমস্ত শুভ লক্ষণে ভূষিত, ৩) অত্যন্ত মনোরম, ৪) জ্যোতির্ময়, ৫) বলবান, ৬) চির-নবযৌবনসম্পন্ন, ৭) সকল ভাষায় পারদর্শী, ৮) সত্যবাদী, ৯) প্রিয়ভাষী, ১০) বাক্পটু, ১১) পরম পণ্ডিত, ১২) পরম বুদ্ধিমান, ১৩) অসাধারণ প্রতিভাশালী, ১৪) শিল্পকলায় পারদর্শী (বিদগ্ধ), ১৫) অত্যন্ত চতুর, ১৬) পরম দক্ষ, ১৭) কৃতজ্ঞ, ১৮) দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, ১৯) স্থান-কাল-পাত্র বিচারে সুদক্ষ, ২০) বৈদিক তত্ত্বজ্ঞানে পারদর্শী ও উপদেশদানে কুশলী, ২১) পবিত্র, ২২) সংযত, ২৩) অবিচল, ২৪) জিতেন্দ্রিয়, ২৫) ক্ষমাশীল, ২৬) গম্ভীর, ২৭) আত্মতৃপ্ত, ২৮) সমদর্শী, ২৯) উদার, ৩০) ধার্মিক, ৩১) বীর, ৩২) কৃপাময়, ৩৩) শ্রদ্ধাবান, ৩৪) বিনয়ী, ৩৫) বদান্য, ৩৬) লজ্জাশীল, ৩৭) শরণাগতদের রক্ষক, ৩৮) সুখী, ৩৯) ভক্তহিতৈষী, ৪০) প্রেমের বশীভূত, ৪১) সর্বমঙ্গলময়, ৪২) সর্বশক্তিমান, ৪৩) পরম যশস্বী, ৪৪) সর্বজনপ্রিয়, ৪৫) ভক্তবৎসল, ৪৬) সকল রমণীর নিকট আকর্ষণীয়, ৪৭) সকলের আরাধ্য, ৪৮) সমস্ত ঐশ্বর্যের অধিকারী, ৪৯) সর্বমান্য এবং ৫০) পরম নিয়ন্তা।

এই পঞ্চাশটি গুণ সমুদ্রের ন্যায় পূর্ণমাত্রায় একমাত্র পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মধ্যেই বিরাজমান।

জীবাত্মারা ভগবানের বিভিন্ন অংশ (বিভিন্নাংশ) হওয়ায়, শুদ্ধ ভক্তির মাধ্যমে তারা এই গুণগুলির কিছু অংশ লাভ করতে পারে। তবে সেই প্রকাশ সর্বদাই আংশিক; একমাত্র ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মধ্যেই এই গুণসমূহ অনন্ত ও পূর্ণরূপে বিদ্যমান।

পদ্মপুরাণে দেবাদিদেব মহাদেব পার্বতীদেবীর নিকট এবং শ্রীমদ্ভাগবতের প্রথম স্কন্ধে ধর্ম ও ধরিত্রীর সংলাপে বহু মহৎ গুণের বর্ণনা রয়েছে। সেখানে সত্য, শৌচ, দয়া, সহিষ্ণুতা, ত্যাগ, সন্তোষ, সরলতা, ইন্দ্রিয়সংযম, মানসিক স্থিরতা, তপস্যা, সমদৃষ্টি, তিতিক্ষা, ক্ষমা, বিদ্যা, জ্ঞান, অনাসক্তি, ঐশ্বর্য, বীরত্ব, প্রভাব, বল, স্মৃতি, দক্ষতা, কান্তি, ধৈর্য, কোমলতা, নম্রতা, দৃঢ়তা, পূর্ণজ্ঞান, কর্মদক্ষতা, গাম্ভীর্য, স্থিরতা, আস্তিক্য, যশ, শ্রদ্ধা ও নিরহঙ্কারিতার মতো গুণসমূহকে মহাপুরুষের অলংকার বলা হয়েছে। অতএব, এই সকল গুণের পূর্ণ বিকাশও স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের মধ্যেই বিদ্যমান।

পূর্বোক্ত পঞ্চাশটি গুণের অতিরিক্ত আরও পাঁচটি গুণ আংশিকভাবে ব্রহ্মা ও শিবের মধ্যেও প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলি হলো—

৫১) অপরিবর্তনশীল,
৫২) সর্বজ্ঞ,
৫৩) চিরনবীন,
৫৪) সচ্চিদানন্দময় স্বরূপবিশিষ্ট এবং
৫৫) সকল যোগসিদ্ধির অধিকারী।

এরপর আরও পাঁচটি গুণ রয়েছে, যা শ্রীনারায়ণের মধ্যেও প্রকাশিত হয়—

৫৬) অচিন্ত্য শক্তিসম্পন্ন,
৫৭) তাঁর দেহ থেকে অনন্ত কোটি ব্রহ্মাণ্ডের প্রকাশ,
৫৮) সকল অবতারের আদি উৎস,
৫৯) শত্রুকেও মুক্তিদানকারী এবং
৬০) মুক্ত আত্মাদের আকর্ষণকারী।

এই ষাটটি গুণের অতিরিক্ত আরও চারটি অনন্য ও অতুলনীয় গুণ কেবল স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের মধ্যেই বিদ্যমান; এমনকি শ্রীনারায়ণেও এই গুণগুলির পূর্ণ প্রকাশ দেখা যায় না। সেগুলি হলো—

৬১) অনুপম ও বিস্ময়কর লীলাবিলাস, বিশেষত বাল্যলীলা।
৬২) অতুলনীয় প্রেমময় ভক্তবৃন্দ দ্বারা সর্বদা পরিবৃত থাকা।
৬৩) বাঁশীর সুমধুর ধ্বনির মাধ্যমে সমগ্র জগতকে আকর্ষণ করার শক্তি।
৬৪) অতুলনীয় ও সর্বোচ্চ রূপমাধুর্য।

এই চারটি বিশেষ গুণ পূর্বোক্ত ষাটটি গুণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শ্রীকৃষ্ণের চৌষট্টি দিব্য গুণাবলী সম্পূর্ণ হয়। শ্রীল রূপ গোস্বামীপাদ বিভিন্ন বৈদিক শাস্ত্র থেকে এই গুণগুলির প্রামাণিক সমর্থন উপস্থাপন করেছেন।

এই চৌষট্টি দিব্য গুণের পূর্ণ প্রকাশ একমাত্র স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মধ্যেই বিদ্যমান। অন্য কোনো জীব, দেবতা কিংবা ভগবানের অন্য কোনো প্রকাশরূপে এই গুণসমূহ পূর্ণমাত্রায় প্রকাশিত হয় না। তাই শাস্ত্রে তাঁকে ‘অখিল-রসামৃত-মূর্তি’, ‘সর্বকারণ-কারণম্’ এবং ‘স্বয়ং ভগবান’ বলে অভিহিত করা হয়েছে।

তাঁর শ্রীচরণে শুদ্ধ ভক্তিই জীবের একমাত্র পরম সম্পদ এবং চিরকল্যাণের পথ।

সংগৃহীত: ভক্তিরসামৃতসিন্ধু গ্রন্থ হতে।
উপস্থাপনা: ✍️ গৌরাচাঁদ দাস

#HareKrishna #Krishna #RadhaKrishna #Bhakti #KrishnaConsciousness #ISKCON #GaudiyaVaishnavism #শ্রীকৃষ্ণ #স্বয়ং_ভগবান #কৃষ্ণতত্ত্ব #কৃষ্ণভক্তি #হরে_কৃষ্ণ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ