যোগিনী একাদশী: মাহাত্ম্য, ব্রতকথা, পূজার বিধি ও নিয়ম
আষাঢ় মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশী তিথি যোগিনী একাদশী নামে পরিচিত। বৈষ্ণব ধর্মে এই একাদশীর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বিষ্ণু পুরাণ ও পদ্মপুরাণ-এর একাদশী মাহাত্ম্য অনুযায়ী, এই ব্রত পালন করলে ৮৮ হাজার ব্রাহ্মণকে আহার করানোর সমতুল্য পুণ্য লাভ হয়। এই একাদশী মানুষের মনকে সংযমী করে, ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করে এবং ভক্তকে মোক্ষ বা কৈবল্য লাভের পথে পরিচালিত করে।
যোগিনী একাদশীর দিন বৈষ্ণব ভক্তরা উপবাস পালন করে ভগবান বিষ্ণু ও দেবী লক্ষ্মীর পূজা-অর্চনা করেন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ভক্তিভরে এই ব্রত পালন করলে জীবনে অর্থকষ্ট দূর হয় এবং শুভ কর্মে সাফল্য লাভ হয়। ভগবান বিষ্ণুর পাশাপাশি মা লক্ষ্মীর কৃপাও লাভ করেন ব্রতধারী।
যোগিনী একাদশীর মাহাত্ম্য
যোগিনী একাদশী ভগবান বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে নিবেদিত একটি পবিত্র ব্রত। পদ্মপুরাণ-এ এই একাদশীর মাহাত্ম্য হেমমালী যক্ষ ও মহর্ষি পুলস্ত্যের সংলাপের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে। পরবর্তীতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে এই ব্রতের মাহাত্ম্য ব্যাখ্যা করেন। মূল কাহিনিতে বর্ণিত হয়েছে, কীভাবে রাজা কুবেরের সেবক হেমমালী যোগিনী একাদশীর ব্রত পালন করে অভিশাপমুক্ত হয়ে মোক্ষের পথ লাভ করেছিলেন।
সারা বছরে মোট ২৪টি একাদশী পালিত হয়। প্রতিটি একাদশীরই নিজস্ব মাহাত্ম্য রয়েছে। অনেক ভক্ত নির্জলা উপবাসও পালন করেন, যা অত্যন্ত কঠিন হলেও বিশেষ পুণ্যদায়ক বলে বিবেচিত।
২০২৫ সালের যোগিনী একাদশীর তিথি
পঞ্চাঙ্গ অনুসারে, আষাঢ় কৃষ্ণপক্ষের একাদশী তিথি শুরু হবে ২১ জুন ২০২৫, সকাল ৭টা ১৯ মিনিটে এবং শেষ হবে ২২ জুন ভোর ৪টা ২৮ মিনিটে। তাই ২০২৫ সালে যোগিনী একাদশীর উপবাস পালন করা হবে ২১ জুন।
পারণের সময়: ২২ জুন ২০২৫
শুভ পারণের সময়: দুপুর ১টা ৪৭ মিনিট থেকে বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত।
যোগিনী একাদশীর ব্রতকথা
অলকাপুরীর অধিপতি ছিলেন মহাদেবের পরম ভক্ত রাজা কুবের। তাঁর সেবায় নিয়োজিত ছিলেন হেমমালী নামে এক যক্ষ। প্রতিদিন তাঁর দায়িত্ব ছিল মানসসরোবর হ্রদ থেকে সুগন্ধি ফুল সংগ্রহ করে কুবেরের কাছে পৌঁছে দেওয়া, যাতে তিনি সেই ফুল দিয়ে ভগবান শিবের পূজা করতে পারেন।
হেমমালীর স্ত্রী বিশালাক্ষী ছিলেন অপরূপা সুন্দরী। একদিন ফুল সংগ্রহ করার পর তিনি কর্তব্য পালনের পরিবর্তে স্ত্রীর প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হয়ে সরাসরি বাড়িতে চলে যান। স্ত্রীর সঙ্গে সুখ-আনন্দে এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েন যে কুবেরের জন্য ফুল পৌঁছে দেওয়ার কথা সম্পূর্ণ ভুলে যান।
এদিকে নির্ধারিত সময়ে কুবের শিবপূজা শুরু করতে গিয়ে দেখলেন, পূজার জন্য প্রয়োজনীয় ফুল নেই। তিনি বিস্মিত ও ক্রুদ্ধ হয়ে একজন যক্ষকে কারণ জানতে বলেন। যক্ষ জানায়, হেমমালী স্ত্রীর সঙ্গে ভোগবিলাসে মত্ত থাকায় ফুল আনতে ভুলে গেছেন।
এই সংবাদ শুনে কুবের প্রচণ্ড রেগে যান। তিনি হেমমালীকে ডেকে বলেন—
"হে পাপিষ্ঠ! কর্তব্য বিস্মৃত হয়ে ইন্দ্রিয়সুখে মত্ত হয়েছ। আমার আরাধ্য শঙ্করের পূজায় অবহেলা করেছ। আমার অভিশাপে তুমি শ্বেতকুষ্ঠে আক্রান্ত হবে এবং স্ত্রীর সঙ্গ থেকেও বিচ্ছিন্ন হবে।"
অভিশাপ কার্যকর হতেই হেমমালী শ্বেতকুষ্ঠে আক্রান্ত হন। দেহ ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়, স্ত্রী থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথিবীতে দুঃখ-কষ্টে দিন কাটাতে থাকেন। তীব্র যন্ত্রণার মধ্যেও তিনি ভগবান শিবের স্মরণ ত্যাগ করেননি।
দীর্ঘদিন বন-জঙ্গল ও পর্বত পরিভ্রমণের পর তিনি হিমালয়ে মহর্ষি মার্কণ্ডেয়ের আশ্রমে পৌঁছান। মহান ঋষিকে প্রণাম করে নিজের সমস্ত অপরাধ ও দুর্দশার কথা খুলে বলেন এবং মুক্তির উপায় জানতে চান।
মহর্ষি মার্কণ্ডেয় করুণাভরে বলেন—
"সামনেই আষাঢ় মাসের কৃষ্ণপক্ষের যোগিনী একাদশী। তুমি যদি ভক্তিভরে এই ব্রত পালন করো, তবে সমস্ত পাপ ও অভিশাপ থেকে মুক্তি লাভ করবে।"
ঋষির নির্দেশ অনুযায়ী হেমমালী নিষ্ঠার সঙ্গে যোগিনী একাদশীর ব্রত পালন করেন। ব্রতের প্রভাবে তিনি শ্বেতকুষ্ঠ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হন, পুনরায় সুদর্শন যক্ষরূপ লাভ করেন এবং অলকাপুরীতে ফিরে গিয়ে স্ত্রী বিশালাক্ষীর সঙ্গে পুনর্মিলিত হন।
এরপর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে বলেন—
"হে রাজন, যোগিনী একাদশীর ব্রত এতই পবিত্র যে এর ফল ৮৮ হাজার ব্রাহ্মণকে ভোজন করানোর সমান। এই ব্রত পালন করলে অতীতের পাপ নষ্ট হয় এবং মানুষ ধর্মপরায়ণ ও মুক্তির যোগ্য হয়ে ওঠে।"
যোগিনী একাদশীর পূজার বিধি
ব্রহ্মমুহূর্তে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে পরিষ্কার বা হলুদ বস্ত্র পরিধান করুন।
ভগবান বিষ্ণু ও মা লক্ষ্মীর ধ্যান করে ব্রতের সংকল্প গ্রহণ করুন।
বিধি অনুযায়ী পূজা সম্পন্ন করুন।
যোগিনী একাদশীর ব্রতকথা পাঠ বা শ্রবণ করুন।
শ্রীহরির আরতি করুন।
অশ্বত্থ গাছের পূজা করলে বিশেষ শুভ ফল লাভ হয়।
দরিদ্র ও অভাবী মানুষকে খাদ্য ও সামর্থ্য অনুযায়ী দান করুন। এতে ভগবান বিষ্ণু প্রসন্ন হন।
যোগিনী একাদশীর ব্রতের নিয়ম
ব্রতের দিন অন্নগ্রহণ থেকে বিরত থাকা উচিত।
যারা সম্পূর্ণ উপবাস করতে পারেন না, তাদেরও ভাত পরিহার করা উচিত।
এই দিনে চুল, নখ ও দাড়ি কাটা উচিত নয়।
ব্রাহ্মণ বা অভাবী ব্যক্তিকে দান করা অত্যন্ত শুভ।
পারণের পরে অন্নদান করলে বিশেষ পুণ্য লাভ হয়।
যোগিনী একাদশী কেবল একটি উপবাস নয়; এটি আত্মসংযম, কর্তব্যনিষ্ঠা, ভক্তি ও আত্মশুদ্ধির এক মহান সাধনা। হেমমালীর কাহিনি আমাদের শিক্ষা দেয়—কর্তব্যে অবহেলা মানুষকে পতনের দিকে নিয়ে যায়, আর ভগবানের প্রতি আন্তরিক ভক্তি, অনুতাপ ও ব্রত পালনের মাধ্যমে জীবনের সবচেয়ে কঠিন অভিশাপ থেকেও মুক্তি লাভ করা সম্ভব।

0 মন্তব্যসমূহ