আনুমানিক ১৫১৩-১৪ খ্রিস্টাব্দের কথা। উত্তর চব্বিশ পরগনার সোদপুর স্টেশন থেকে সামান্য দূরে, গঙ্গার তীরে অবস্থিত শান্ত ও স্নিগ্ধ পানিহাটি গ্রাম। একদিন এই গ্রামের শ্রীল রাঘব পণ্ডিত গোস্বামীর বাড়িতে এসে উপস্থিত হলেন শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু।
সেই সময় সপ্তগ্রামের জমিদার গোবর্ধন রায়ের একমাত্র পুত্র, পরম বৈষ্ণব রঘুনাথ দাস গোস্বামী নিত্যানন্দ প্রভুর দর্শন ও কৃপালাভের আশায় পানিহাটিতে ছুটে আসেন। গঙ্গাতীরে এসে তিনি দেখলেন—এক বিশাল বটবৃক্ষের নিচে বেদীর ওপর কোটি সূর্যের মতো জ্যোতির্ময় হয়ে বসে আছেন নিত্যানন্দ প্রভু, আর তাঁকে ঘিরে রয়েছেন অসংখ্য ভক্ত। রঘুনাথ দাস দূর থেকেই প্রভুকে সাষ্টাঙ্গে দণ্ডবৎ প্রণাম জানালেন।
### নিত্যানন্দ প্রভুর মধুর 'দণ্ড' ও মহোৎসবের সূচনা
এক ভক্ত নিত্যানন্দ প্রভুকে জানালেন যে রঘুনাথ তাঁকে প্রণাম করছেন। তা শুনে প্রভু কৌতুক করে বলে উঠলেন:
> "ওরে চোর! এতদিনে তুই দেখা দিলি? আয়, আয়, আজ তোকে আমি দণ্ড দেব।"
>
লজ্জা ও সংকোচে রঘুনাথ কাছে আসতে না চাইলে নিত্যানন্দ প্রভু তাঁকে জোর করে কাছে টেনে নেন এবং তাঁর মস্তক নিজের শ্রীচরণপদ্মে স্থাপন করেন। এরপর তিনি বলেন, "তুই চোরের মতো দূরে দূরে পালিয়ে বেড়াস। আজ তোকে পেয়েছি, তাই তোকে শাস্তি দেব। আমার সমস্ত ভক্তদের তুই চিড়া-দধি খাওয়াবি।"
### উৎসবের এলাহী আয়োজন
প্রভুর এই মধুর 'দণ্ড' বা শাস্তি শুনে রঘুনাথ দাসের আনন্দের সীমা রইল না। তিনি তৎক্ষণাৎ লোক পাঠিয়ে প্রচুর পরিমাণে চিড়া, দই, দুধ, সন্দেশ, চিনি, ঘি, কর্পূর ও কলা আনিয়ে নিলেন। আশেপাশের গ্রাম থেকেও প্রচুর খাদ্যসামগ্রী চলে এলো। আয়োজনের জন্য আনা হলো চারশোটি মাটির খোলামকুচি (হোলনা) এবং বেশ কয়েকটি বিশাল মাটির পাত্র।
অভিজ্ঞ ব্রাহ্মণদের তত্ত্বাবধানে শুরু হলো প্রস্তুতি:
* কোনো পাত্রে গরম দুধে চিড়া ভেজানো হলো।
* কোনো পাত্রে দই, চিনি ও কলা মাখা হলো।
* অন্য পাত্রে ঘন ক্ষীরের সাথে কলা, চিনি, ঘি ও সামান্য কর্পূর মেশানো হলো।
এইভাবে প্রস্তুত করা সাতটি বড় বড় পাত্র নিত্যানন্দ প্রভুর সামনে রাখা হলো। চাতালের ওপর নিত্যানন্দ প্রভু ও তাঁর প্রধান সঙ্গীরা মণ্ডলাকারে বসলেন। উৎসবের খবর শুনে আসা সমস্ত ব্রাহ্মণ, পণ্ডিত ও পুরোহিতদেরও চাতালে বসানো হলো। সবাইকে দুটি করে মাটির পাত্র দেওয়া হলো—একটিতে দুধ-চিড়া, অন্যটিতে দধি-চিড়া।
স্থান সংকুলান না হওয়ায় অসংখ্য ভক্ত চাতালের নিচে, গঙ্গার ঘাটে, এমনকি জলের মধ্যে নেমে মাটির পাত্র ভাসিয়ে রেখে পরমানন্দে অপেক্ষা করতে লাগলেন। প্রায় কুড়িজন পরিবেশনকারী সবাইকে চিড়া-দধি পরিবেশন করলেন। কিন্তু প্রভুর নির্দেশের অপেক্ষায় কেউই ভোজন শুরু করছিলেন না।
### শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অলৌকিক আগমন
এমন সময় সেখানে এসে উপস্থিত হলেন রাঘব পণ্ডিত গোস্বামী। এই বিপুল আয়োজন দেখে তিনি হেসে বললেন, "প্রভু, আমি আপনার জন্য ঘরে রাজভোগ নিবেদন করে রেখেছি, আর আপনি এখানে উৎসব করছেন!" নিত্যানন্দ প্রভু হেসে উত্তর দিলেন, "আমি জাতিতে গোপ (গোয়ালা)। তাই নদীর তীরে এই গোপালদের সাথে মেতে উঠতেই আমার বেশি আনন্দ হয়। তোমার ঘরে আমি রাতেই প্রসাদ পাব।"
এরপর এক অলৌকিক লীলা ঘটল। ভক্তদের ভোজনের পূর্বে নিত্যানন্দ প্রভু ধ্যানের মাধ্যমে পুরী ধাম থেকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে সেখানে আবাহন করলেন। মহাপ্রভুর আগমন ঘটতেই নিত্যানন্দ প্রভু উঠে দাঁড়ালেন।
> দুই প্রভু হাসতে হাসতে প্রতিটি পাত্র থেকে এক এক গ্রাস চিড়া নিয়ে একে অপরের মুখে তুলে দিতে লাগলেন। তাঁরা ঘুরে ঘুরে সব ভক্তের পাত্র থেকে চিড়া আস্বাদন করলেন।
>
সেখানে উপস্থিত সকল ভক্ত এই অলৌকিক লীলা দেখতে পাচ্ছিলেন না; কারণ মহাপ্রভু কেবল পরম ভাগ্যবানদের চোখেই দৃশ্যমান ছিলেন। বাকিরা কেবল দেখছিলেন নিত্যানন্দ প্রভু একা একাই আনন্দ নৃত্য করছেন।
### পরমানন্দে মহাপ্রসাদ গ্রহণ
লীলা শেষে নিত্যানন্দ প্রভু আসনে বসে সবাইকে উচ্চস্বরে হরিনাম করতে করতে ভোজন শুরু করার নির্দেশ দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে "হরি হরি" ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠল।
চিড়া-দধি মুখে দিতেই ভক্তদের এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো। তাঁদের মনে হলো, তাঁরা পানিহাটির গঙ্গাতীরে নেই, বরং স্বয়ং বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ ও বলরামের সাথে যমুনার তীরে বসে 'পুলিন ভোজন' (বনভোজন) করছেন।
উৎসবের খবর ছড়িয়ে পড়লে আশেপাশের গ্রাম থেকে আরও শত শত মানুষ চিড়া, দই, মিষ্টি নিয়ে আসতে লাগলেন। দয়ালু রঘুনাথ দাস সবকিছুর ন্যায্য মূল্য চুকিয়ে দিয়ে আসা সমস্ত মানুষকে সেই প্রসাদ খাওয়ালেন। ভোজন শেষে নিত্যানন্দ প্রভুর পাত্রের অবশিষ্টাংশ (অধরামৃত) রঘুনাথ দাস পেলেন এবং বাকি পাত্রগুলোর প্রসাদ ভক্তদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া হলো।
### সন্ধ্যার সংকীর্তন ও উৎসবের সমাপ্তি
সন্ধ্যা নামতেই শুরু হলো শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর মহতী হরিনাম সংকীর্তন। সেই কীর্তনের প্রেমবন্যায় যেন চারদিক ভেসে গেল। অনেকে সেই নৃত্যের মাঝে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকেও নিত্যানন্দ প্রভুর সাথে নাচতে দেখলেন, যদিও বাহ্যিকভাবে মহাপ্রভু তখন সুদূর জগন্নাথপুরীতে অবস্থান করছিলেন।
### পানিহাটি উৎসবের ঐতিহ্য
রঘুনাথ দাস গোস্বামীর ভক্তি এবং নিত্যানন্দ প্রভুর অপার করুণার এই মহিমান্বিত স্মৃতিকে স্মরণ করে আজও প্রতি বছর **আষাঢ় মাসের শুক্লা ত্রয়োদশী তিথিতে** পানিহাটির সেই ঐতিহাসিক বটবৃক্ষতলে পরম শ্রদ্ধায় ও উৎসবে 'চিড়া-দধি মহোৎসব' (দণ্ড মহোৎসব) উদযাপিত হয়ে আসছে।
*হরে কৃষ্ণ।*

0 মন্তব্যসমূহ