শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের স্নানযাত্রার মাহাত্ম্য
পতিতপাবন, পরম করুণাময় শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা মহোৎসব বৈষ্ণব সমাজের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় উৎসব। এটি কেবল একটি প্রাচীন আচার নয়; বরং ভগবানের অসীম করুণা, ভক্তবৎসলতা এবং সমগ্র মানবজাতির কল্যাণকামিতার এক অনন্য প্রকাশ।
গরুড় পুরাণে বলা হয়েছে—
«তুলসী-মিশ্র তোয়েন স্নাপয়ন্তি জনার্দনঃ।
পূজয়ন্তি চ ভাবেন ধন্যাস্তে ভূরি মানবাঃ।।»
অর্থাৎ, যারা তুলসী-মিশ্রিত পবিত্র জলে ভগবান জনার্দনকে স্নান করিয়ে ভক্তিভরে তাঁর পূজা করেন, তারাই প্রকৃত অর্থে ধন্য।
আবার অগ্নি পুরাণে বলা হয়েছে—
«মহাস্নানেন গোবিন্দং সম্যক্ সংস্নাতস্য মানবঃ।
যং যং প্রার্থয়েত্ কামং তং তং প্রাপ্নোত্যসংশয়ঃ।।»
অর্থাৎ, যে ব্যক্তি শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী শ্রীগোবিন্দের মহাস্নান সম্পন্ন করে আন্তরিকভাবে যে অভীষ্ট কামনা করেন, তিনি নিঃসন্দেহে সেই ফল লাভ করেন।
সাধারণত ভক্তদের পক্ষে মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত অর্চাবিগ্রহকে নিজ হাতে স্নান করানোর সুযোগ হয় না। কিন্তু প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে অনুষ্ঠিত শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা মহোৎসবে সেই দুর্লভ সৌভাগ্য সকল ভক্তের জন্য উন্মুক্ত হয়। তবে অধিমাস (মলমাস) উপস্থিত হলে তিথি অনুসারে এই উৎসব আষাঢ় মাসেও অনুষ্ঠিত হতে পারে।
শাস্ত্রবর্ণনা অনুসারে, স্বায়ম্ভুব মনুর রাজত্বকালে জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা তিথিতে এক মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়। সেই যজ্ঞকুণ্ড থেকে স্বয়ং জগদীশ্বর আবির্ভূত হন। এই কারণেই স্নানপূর্ণিমাকে শ্রীজগন্নাথদেবের আবির্ভাব তিথি হিসেবেও মান্য করা হয়। ভগবানের আদেশে স্বায়ম্ভুব মনুই প্রথম তাঁকে স্নানবেদীতে প্রতিষ্ঠা করে মহাস্নান উৎসবের সূচনা করেন।
পরবর্তীকালে মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন নীলাচলধামে শ্রীজগন্নাথ, শ্রীবলরাম, দেবী সুভদ্রা ও শ্রীসুদর্শনকে স্নানবেদীতে এনে মহাসমারোহে মহাস্নান অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন। সেই প্রাচীন ঐতিহ্য আজও অবিচ্ছিন্নভাবে পালিত হয়ে আসছে।
বর্তমানেও বিশ্বের বিভিন্ন শ্রীজগন্নাথ মন্দিরে গভীর ভক্তি ও উৎসাহের সঙ্গে এই মহোৎসব উদ্যাপিত হয়। বিশেষ করে শ্রীমায়াপুরের নিকটবর্তী ইসকন রাজাপুর জগন্নাথ মন্দিরে স্নানযাত্রা উপলক্ষে গঙ্গা থেকে শোভাযাত্রার মাধ্যমে পবিত্র জল সংগ্রহ করা হয়। হাতি, হরিনাম-সংকীর্তন, বাদ্যযন্ত্র ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রাসহ সেই জল মন্দিরে আনা হয়। মঙ্গলারতির পর ভক্ত, অতিথি এবং স্থানীয় বাসিন্দারা সারিবদ্ধভাবে উন্মুক্ত স্নানবেদীতে অধিষ্ঠিত শ্রীবলরাম, দেবী সুভদ্রা, শ্রীজগন্নাথ ও শ্রীসুদর্শনকে নিজ হাতে স্নান করানোর বিরল সৌভাগ্য লাভ করেন।
স্নানপর্ব চলাকালে চারদিকে শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, "জয় জগন্নাথ" ধ্বনি, হরিনাম-সংকীর্তন এবং বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণে সমগ্র পরিবেশ মুখরিত হয়ে ওঠে। খোল, করতাল ও বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের মধুর ধ্বনিতে উৎসব প্রাণবন্ত ও আনন্দময় হয়ে ওঠে।
প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টাব্যাপী মহাস্নান সম্পন্ন হওয়ার পর শ্রীজগন্নাথ, শ্রীবলরাম ও দেবী সুভদ্রাকে পুনরায় মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর মহাআরতির সময় শ্রীজগন্নাথ ও শ্রীবলরাম গজবেশ এবং দেবী সুভদ্রা পদ্মবেশ ধারণ করেন। এই শুভক্ষণে ভক্তরা মহাপ্রসাদ গ্রহণ করেন, ভগবানের লীলাকথা শ্রবণ করেন এবং জগন্নাথ-স্তব, ভজন ও হরিনাম-সংকীর্তনে অংশগ্রহণ করেন।
সন্ধ্যার আরতির পর থেকে পরবর্তী পনেরো দিন পর্যন্ত মন্দিরের দরজা সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ থাকে। এই সময়কে অনবসর কাল বলা হয়। বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, মহাস্নানের পর শ্রীজগন্নাথদেব জ্বরলীলা প্রকাশ করেন। তাই এই সময়ে বিশেষ সেবকবৃন্দ তাঁকে পাচন, মিষ্টি পানা, ছানা, মাখন, মিছরি, এলাচ, গোলমরিচ-সংমিশ্রিত বিশেষ ভোগ এবং বিভিন্ন ফল নিবেদন করেন।
অনবসর কালে শ্রীবিগ্রহের অঙ্গরাগ ও নবসজ্জার কার্য সম্পন্ন হয়। পনেরো দিন পর ভগবান নবযৌবনময় রূপে ভক্তদের দর্শন প্রদান করেন। এই মহামঙ্গলময় দর্শন নেত্রোৎসব বা নবযৌবন দর্শন নামে পরিচিত।
এরপর অনুষ্ঠিত হয় গুণ্ডিচা মন্দির মার্জন এবং পরবর্তীতে মহাসমারোহে রথযাত্রা। সুসজ্জিত রথে আরোহণ করে শ্রীজগন্নাথ, শ্রীবলরাম ও দেবী সুভদ্রা মহাসংকীর্তন, নৃত্য ও অগণিত ভক্তের জয়ধ্বনির মধ্য দিয়ে গুণ্ডিচা মন্দিরে গমন করেন। সেখানে নয় দিন অবস্থান শেষে পুনরায় মূল মন্দিরে প্রত্যাবর্তন করেন।
শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের এই সকল মহোৎসব মানুষের হৃদয় থেকে হিংসা, বিভেদ, অহংকার ও কলুষতা দূর করে ভক্তি, প্রেম, সাম্য, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যের বাণী ছড়িয়ে দেয়। বিশেষত স্নানযাত্রা মহোৎসব ভক্তের হৃদয়কে শুদ্ধ করে এবং ভগবানের অকারণ করুণার প্রতি অটল বিশ্বাস ও আশ্রয় গ্রহণের প্রেরণা জাগিয়ে তোলে।
আসুন, আমরা সকলে ভক্তি, শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতার সঙ্গে শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের পবিত্র স্নানযাত্রা মহোৎসব উদ্যাপন করি এবং তাঁর অকারণ কৃপায় আমাদের জীবনকে ভক্তি, প্রেম ও সেবাময় করে তুলি।
জয় জগন্নাথ!
হরে কৃষ্ণ।

0 মন্তব্যসমূহ