ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়🙏
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা
দ্বিতীয় অধ্যায়
সাংখ্যযোগ
শ্রীভগবান উবাচ
যঃ সর্বত্রানভিস্নেহস্তত্তত্প্রাপ্য শুভাশুভম্৷
নাভিনন্দতি ন দ্বেষ্টি তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা৷৷৫৭
অর্থ: জড়জগতে যিনি সমস্থ জড়বিষয়ে আসক্তি রহিত, যিনি প্রিয় বস্তু লাভে আনন্দিত হন না এবং অপ্রিয় বিষয় উপস্থিত হলে দুঃখিত হন না তার চেতনা পুর্ণজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
আমরা যে শিক্ষাগুলো পাই:
-
অতিরিক্ত আসক্তি পরিহার করা
- জাগতিক বস্তু, অর্থ, পদ-মর্যাদা বা মানুষের প্রতি অতি-আসক্ত না হওয়া।
- উদাহরণ: নতুন মোবাইল পেয়ে অহংকারে ভেসে না যাওয়া, আবার সেটি নষ্ট হলে ভেঙে না পড়া।
-
সাফল্যে অহংকার না করা
- ভালো কিছু ঘটলে আনন্দিত হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু আত্মভোলা উচ্ছ্বাসে না ভাসা।
- উদাহরণ: পরীক্ষায় প্রথম হলে কৃতজ্ঞ থাকা, কিন্তু অন্যদের তুচ্ছ না করা।
-
ব্যর্থতায় হতাশ না হওয়া
- অপ্রিয় ঘটনা বা ক্ষতির সময় ধৈর্য ধরে থাকা।
- উদাহরণ: চাকরির ইন্টারভিউতে ব্যর্থ হলে নিজেকে শেষ মনে না করে আবার চেষ্টা করা।
-
সুখ-দুঃখে সমভাব রাখা
- জীবনের উত্থান-পতনকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা।
- উদাহরণ: ব্যবসায় লাভ হলে যেমন শান্ত থাকা, লোকসান হলেও তেমনি বিচলিত না হওয়া।
-
স্থিতপ্রজ্ঞ বা পরিণত মন গঠন করা
- যার মন বাহ্যিক ঘটনার দ্বারা সহজে বিচলিত হয় না, সে জ্ঞানী ও স্থিরচিত্ত।
- উদাহরণ: প্রশংসা পেলে যেমন শান্ত থাকা, সমালোচনা পেলেও সংযম না হারানো।
মূল শিক্ষা:
জীবনের শুভ-অশুভ, লাভ-ক্ষতি, সুখ-দুঃখকে সমভাবে গ্রহণ করে কর্তব্যপথে অবিচল থাকা—এটাই এই শ্লোকের প্রধান বার্তা। তখন মন স্থির হয় এবং প্রকৃত জ্ঞান বিকশিত হয়।
যদা সংহরতে চায়ং কূর্মোঙ্গানীব সর্বশঃ৷
ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেভ্যস্তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা৷৷৫৮
অর্থ: কর্ম যেমন তার অঙ্গসমূহ, তার কঠিন বহিরাবরণের মধ্যে সংঙ্কুচিত করে, তেমনই যে ব্যক্তি তার ইন্দ্রিয়গুলিকে ইন্দ্রিয়ের বিষয় থেকে প্রত্যাহার করে নিতে পারেন তার চেতনা চিন্ময় জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত।
এই শ্লোকটি -এ ইন্দ্রিয়সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দেয়।
সংক্ষেপে শিক্ষাগুলো
-
ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন
- চোখ, কান, জিহ্বা, মন ইত্যাদি যেন আমাদের নিয়ন্ত্রণ না করে; বরং আমরা যেন এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করি।
- উদাহরণ: অপ্রয়োজনীয় সোশ্যাল মিডিয়া দেখার ইচ্ছা হলেও নিজেকে সংযত রাখা।
-
প্রলোভন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া
- ক্ষতিকর বা অনৈতিক বিষয়ে আকৃষ্ট হলে সেখান থেকে সরে আসা জ্ঞানীর লক্ষণ।
- উদাহরণ: পরীক্ষায় নকল করার সুযোগ থাকলেও তা না করা।
-
কচ্ছপের মতো আত্মরক্ষা করা
- কচ্ছপ বিপদে অঙ্গ গুটিয়ে নেয়; তেমনি মানুষও বিপথগামী পরিবেশ থেকে নিজেকে রক্ষা করবে।
- উদাহরণ: খারাপ সঙ্গ বা নেতিবাচক আলোচনায় না জড়ানো।
-
সংযম মানেই দমন নয়, সচেতন নিয়ন্ত্রণ
- ইন্দ্রিয়কে সম্পূর্ণ নষ্ট করা নয়, প্রয়োজনমতো ব্যবহার করা এবং প্রয়োজন হলে প্রত্যাহার করা।
- উদাহরণ: সুস্বাদু খাবার খাওয়া, কিন্তু অতিভোজন না করা।
-
আত্মিক ও মানসিক স্থিরতা অর্জন
- যে ব্যক্তি ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তার মন সহজে বিচলিত হয় না।
- উদাহরণ: রাগ উসকে দেওয়ার মতো কথা শুনেও শান্তভাবে উত্তর দেওয়া।
মূল শিক্ষা
যিনি প্রয়োজনমতো নিজের ইন্দ্রিয় ও মনকে নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষতিকর আকর্ষণ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন, তিনিই স্থিরবুদ্ধি ও প্রকৃত জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হন। কচ্ছপের মতো আত্মসংযমই এই শ্লোকের মূল বার্তা।
বিষয়া বিনিবর্তন্তে নিরাহারস্য দেহিনঃ৷
রসবর্জং রসোপ্যস্য পরং দৃষ্ট্বা নিবর্ততে৷৷৫৯
অর্থ: দেহবিশিষ্ট জীব ইন্দ্রিয় সুখভোগ থেকে নিবৃত হতে পারে কিন্তু তবুও ইন্দ্রিয় সুখভোগের আসক্তি থেকে যায়। কিন্তু উচ্চতর স্বাধ আস্বাদন করার ফলে সে বিষয়-তৃষ্ণা থেকে তিনি চিরতরে নিবৃত্ত হন।
এই শ্লোকটি -এ শেখায় যে শুধু বাহ্যিকভাবে ভোগ ত্যাগ করলেই আসক্তি দূর হয় না; উচ্চতর আনন্দ লাভ করলে তবেই আসক্তি সত্যিকার অর্থে দূর হয়।
সংক্ষেপে শিক্ষাগুলো
-
বাহ্যিক ত্যাগই যথেষ্ট নয়
- কোনো বিষয় থেকে দূরে থাকলেও মনের মধ্যে তার আকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে।
- উদাহরণ: ডায়েট করার জন্য মিষ্টি না খাওয়া, কিন্তু সারাক্ষণ মিষ্টির কথাই ভাবা।
-
মনের আসক্তি দূর করা প্রয়োজন
- প্রকৃত সংযম হলো শুধু কাজের নয়, মনেরও নিয়ন্ত্রণ।
- উদাহরণ: ধূমপান ছেড়ে দিলেও যদি মনে সবসময় সিগারেটের ইচ্ছা জাগে, তবে আসক্তি পুরোপুরি যায়নি।
-
উচ্চতর আনন্দ নিম্নতর আকর্ষণকে দূর করে
- আধ্যাত্মিক জ্ঞান, ভক্তি, সৎকর্ম বা মহৎ উদ্দেশ্যের আনন্দ পেলে জাগতিক ভোগের আকর্ষণ কমে যায়।
- উদাহরণ: একজন ছাত্র যখন জ্ঞান অর্জনের আনন্দ পায়, তখন অপ্রয়োজনীয় বিনোদনে সময় নষ্ট করার আগ্রহ কমে যায়।
-
শূন্যতা নয়, ইতিবাচক বিকল্প প্রয়োজন
- খারাপ অভ্যাস ত্যাগ করতে হলে তার জায়গায় ভালো কিছু গ্রহণ করতে হয়।
- উদাহরণ: অকারণে মোবাইল ব্যবহার কমিয়ে বই পড়া, ব্যায়াম বা সেবামূলক কাজে সময় দেওয়া।
-
আত্মিক উপলব্ধিই স্থায়ী মুক্তি দেয়
- পরম সত্য বা ঈশ্বরচেতনার স্বাদ পেলে জাগতিক তৃষ্ণা স্বাভাবিকভাবেই ক্ষীণ হয়ে যায়।
- উদাহরণ: যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে সাধনা ও ভক্তিতে আনন্দ পায়, তার কাছে ক্ষণস্থায়ী ভোগের আকর্ষণ অনেক কম মনে হয়।
মূল শিক্ষা
জোর করে ভোগ দমন করলে আকাঙ্ক্ষা থেকে যেতে পারে; কিন্তু উচ্চতর, নির্মল ও স্থায়ী আনন্দের স্বাদ পেলে নিম্নতর ভোগের প্রতি আসক্তি স্বাভাবিকভাবেই দূর হয়ে যায়। এটাই এই শ্লোকের প্রধান বার্তা।
যততো হ্যপি কৌন্তেয় পুরুষস্য বিপশ্চিতঃ৷
ইন্দ্রিয়াণি প্রমাথীনি হরন্তি প্রসভং মনঃ৷৷৬০
অর্থ: হে কৌন্তেয়, ইন্দ্রিয়সমুহ এত বলবান এবং ক্ষোভকারী যে তারা অতি যত্নশীল বিবেকসম্পন্ন পুরুষের মনকেও বলপূর্বক হরণ করে, বিচলিত করে দেয়।
এর মূল শিক্ষা হলো—ইন্দ্রিয় (চোখ, কান, জিহ্বা, নাক, ত্বক) খুব শক্তিশালী; তাই জ্ঞানী ও সচেতন মানুষও অসতর্ক হলে ইন্দ্রিয়ের টানে বিচলিত হতে পারেন।
সংক্ষেপে শিক্ষাগুলো
-
নিজের উপর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস করা উচিত নয়
- যত জ্ঞানী হই না কেন, প্রলোভনের সামনে সতর্ক থাকতে হবে।
- উদাহরণ: একজন মেধাবী ছাত্র মোবাইলে একটু সোশ্যাল মিডিয়া দেখবে ভেবে বসে, পরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নষ্ট করে ফেলে।
-
ইন্দ্রিয়-সংযম আধ্যাত্মিক ও নৈতিক উন্নতির জন্য জরুরি
- শুধু জ্ঞান অর্জন যথেষ্ট নয়; অভ্যাস ও সংযমও প্রয়োজন।
- উদাহরণ: ডাক্তার জানেন অতিরিক্ত মিষ্টি ক্ষতিকর, তবুও লোভ সংযত না করলে নিজেই অসুস্থ হতে পারেন।
-
সতর্কতা সবসময় প্রয়োজন
- মন একবার ইন্দ্রিয়ের বশে গেলে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
- উদাহরণ: রাগের মুহূর্তে কটু কথা বলে পরে অনুতপ্ত হওয়া।
-
ভালো পরিবেশ ও সঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ
- প্রলোভন থেকে দূরে থাকলে মনকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।
- উদাহরণ: পরীক্ষার সময় পড়াশোনার পরিবেশে থাকা, অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি থেকে দূরে থাকা।
সারকথা
এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে ইন্দ্রিয়ের শক্তিকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। জ্ঞান, আত্মসচেতনতা, সংযম এবং ঈশ্বরস্মরণ/সাধনার মাধ্যমে মনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়; নইলে ইন্দ্রিয়ের টানে জ্ঞানী ব্যক্তিও পথভ্রষ্ট হতে পারেন।

0 মন্তব্যসমূহ