অনলাইন গীতা ক্লাস – পর্ব ২০
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার মঙ্গলাচরণ
ওঁ অজ্ঞানতিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জন-শলাকয়া।চক্ষুরুন্মীলিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।।
****অর্থ: অজ্ঞতার গভীর অন্ধকারে আমি নিমজ্জিত ছিলাম। গুরুদেব জ্ঞানের অঞ্জনের দ্বারা সেই অন্ধকার দূর করে আমার জ্ঞানচক্ষু উন্মুক্ত করেছেন। সেই শ্রীগুরুকে আমি প্রণাম জানাই।
🙏 নিজ নিজ গুরুদেবের প্রণাম-মন্ত্র পাঠ করুন 🙏
বাঞ্ছা-कल्प-তরুভ্যশ্চ কৃপা-সিন্ধুভ্য এব চ।
পতিতানাং পাবনেব্যো বৈষ্ণবেব্যো নমো নমঃ।।
****অর্থ: যাঁরা মনোবাঞ্ছা পূরণকারী, করুণার সাগর এবং পতিত আত্মাদের পরিত্রাতা—সেই সকল বৈষ্ণব ভক্তদের প্রতি আমার বারংবার প্রণাম।
মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্।যৎ কৃপা তমহং বন্দে পরমানন্দ মাধবম্।।
****অর্থ: যাঁর কৃপায় বোবা বাকপটু হয় এবং পঙ্গুও পর্বত অতিক্রম করতে সক্ষম হয়—সেই পরমানন্দময় মাধবকে আমি বন্দনা করি।
তপ্ত-কাঞ্চন-গৌরাঙ্গি রাধে বৃন্দাবনেশ্বরী।বৃষভানু-সুতে দেবি প্রণমামি হরিপ্রিয়ে।।
****অর্থ: হে রাধারাণী! তপ্ত স্বর্ণের ন্যায় তোমার কান্তি। তুমি বৃন্দাবনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী, রাজা বৃষভানুর কন্যা এবং ভগবান হরির পরম প্রিয়া। তোমাকে আমি শ্রদ্ধাভরে প্রণাম জানাই।
হে কৃষ্ণ করুণাসিন্ধো দীনবন্ধো জগৎপতে।গোপেশ গোপিকাকান্ত রাধাকান্ত নমোস্তুতে।।
****অর্থ: হে করুণাময় কৃষ্ণ! তুমি দীনবন্ধু, জগতের অধিপতি, গোপবৃন্দের প্রভু ও গোপীদের প্রিয়তম। হে রাধাকান্ত, তোমাকে আমার প্রণাম।
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু নিত্যানন্দ।
শ্রীঅদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি গৌরভক্তবৃন্দ।।
****অর্থ: শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, নিত্যানন্দ প্রভু, শ্রীঅদ্বৈত আচার্য, গদাধর, শ্রীবাস এবং সমগ্র গৌরভক্তবৃন্দের চরণে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম।
✨ মহামন্ত্র ✨
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে 🙏
ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়🙏
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা
দ্বিতীয় অধ্যায়
সাংখ্যযোগ
শ্রীভগবান উবাচ
কর্মজং বুদ্ধিযুক্তা হি ফলং ত্যক্ত্বা মনীষিণঃ৷
জন্মবন্ধবিনির্মুক্তাঃ পদং গচ্ছন্ত্যনাময়ম্৷৷৫১
অর্থ: মনিষীগণ ভগবানের সেবায় যুক্ত হয়ে ভগবানের শ্বরণাগত হন। কর্মজাত ফল ত্যাগ করে জন্মমৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্ত হন।এইভাবে তারা সমস্ত দুঃখ দুর্দশা থেকে মুক্ত হন
📘 আমরা কী শিক্ষা পাই?
১. কর্ম কর, কিন্তু ফলের প্রতি আসক্ত হয়ো না
আমরা জীবনে কাজ করবো—কিন্তু সেই কাজের ফল (লাভ-লোকসান, জয়-পরাজয়) নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করবো না।
👉 উদাহরণ:
একজন ছাত্র পরীক্ষার জন্য মনোযোগ দিয়ে পড়ে। কিন্তু সে যদি শুধু “আমি প্রথম হবো” এই চিন্তায় ব্যস্ত থাকে, তাহলে চাপ ও ভয় বাড়বে। বরং সে যদি শুধু নিজের দায়িত্ব (পড়া) ঠিকভাবে করে, তাহলে মন শান্ত থাকবে।
২. ঈশ্বরের প্রতি আত্মসমর্পণ (শরণাগতি)
নিজের কাজকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করলে অহংকার কমে এবং মন পরিষ্কার হয়।
👉 উদাহরণ:
একজন ডাক্তার রোগীর চিকিৎসা করছেন। তিনি যদি ভাবেন “আমি শুধু আমার দায়িত্ব পালন করছি, ফল ঈশ্বরের হাতে”, তাহলে তিনি মানসিকভাবে স্থির থাকবেন—সাফল্য বা ব্যর্থতা তাকে বেশি নাড়াতে পারবে না।
৩. আসক্তি কমলে দুঃখ কমে
আমাদের দুঃখের বড় কারণ হলো ফলের প্রতি আসক্তি—“এটা আমারই হতে হবে” এই চিন্তা।
👉 উদাহরণ:
কেউ ব্যবসা শুরু করলো। যদি সে লাভ না হলে ভেঙে পড়ে, তাহলে সে দুঃখ পাবে। কিন্তু যদি সে অভিজ্ঞতা হিসেবে নেয় এবং চেষ্টা চালিয়ে যায়, তাহলে মানসিকভাবে শক্ত থাকবে।
৪. জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তির পথ
এই শ্লোক আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে বলে—ফল ত্যাগ ও ঈশ্বরভক্তির মাধ্যমে মানুষ সংসারের বন্ধন (জন্ম-মৃত্যু) থেকে মুক্তি পায়।
👉 এটি শুধু ধর্মীয় দিক নয়, বাস্তব জীবনেও এর মানে— মানুষ দুশ্চিন্তা, ভয়, হতাশা থেকে মুক্ত হয়ে শান্তি পায়।
🌱 সংক্ষেপে
এই শ্লোক আমাদের শেখায়—
- দায়িত্ব পালন করো
- ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হয়ো না
- নিজের কাজকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে করো
- তাহলে মানসিক শান্তি ও মুক্তি পাওয়া যায়
যদা তে মোহকলিলং বুদ্ধির্ব্যতিতরিষ্যতি৷
তদা গন্তাসি নির্বেদং শ্রোতব্যস্য শ্রুতস্য চ৷৷৫২
অর্থ: এইভাবে পরমেশ্বর ভগবানের উপর অর্পিত নিষ্কাম কর্ম অভ্যাস করতে করতে তোমার বুদ্ধি মোহরুপ গভীর অরণ্যকে সম্পূর্নরুপে অতিক্রম করবে, তখন তুমি যা কিছু শুনেছ সেই সবের প্রতি সম্পূর্ণরুপে নিরপেক্ষ হয়ে বিশুদ্ধ ভক্তি সাধনে প্রবৃত্ত হবে।
এখান থেকে আমরা যে শিক্ষাগুলো পাই, তা নিচে সহজভাবে আলোচনা করা হলো:
### ১. মোহ থেকে মুক্তি
আমাদের বুদ্ধি যখন জাগতিক মায়া, আসক্তি এবং বিভ্রান্তির (মোহরূপ অরণ্য) জালে আটকে থাকে, তখন আমরা সঠিক ও ভুলের পার্থক্য করতে পারি না। এই শ্লোকটি শেখায় যে, **নিষ্কাম কর্মযোগের** মাধ্যমে বুদ্ধিকে স্বচ্ছ করা সম্ভব। যখন বুদ্ধি এই বিভ্রান্তি কাটিয়ে ওঠে, তখনই মানুষ প্রকৃত সত্যের দেখা পায়।
### ২. শাস্ত্রীয় পাণ্ডিত্যের অহংকার ত্যাগ
একজন মানুষ অনেক কিছু শুনতে পারে বা শাস্ত্র অধ্যয়ন করতে পারে। কিন্তু কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান বা শাস্ত্রীয় বিধিবিধানের গোলকধাঁধায় আটকে থাকলে প্রকৃত শান্তি পাওয়া যায় না। শ্লোকটি বলছে, যখন বুদ্ধির পরিশুদ্ধি ঘটে, তখন মানুষ "শ্রুতস্য" (যা শোনা হয়েছে) এবং "শ্রোতব্যস্য" (যা শোনার বাকি আছে) অর্থাৎ সমস্ত জাগতিক ও বৈদিক কর্মফলের আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্ত হয়ে যায়।
### ৩. বৈরাগ্য বা নির্বেদ লাভ
'নির্বেদ' শব্দের অর্থ হলো অনাগ্রহ বা বৈরাগ্য। যখন কেউ বুঝতে পারে যে জাগতিক কোনো প্রাপ্তিই স্থায়ী আনন্দ দিতে পারে না, তখন তার মধ্যে এক ধরণের পরম বৈরাগ্য আসে। এটি কোনো নেতিবাচক বিরাগ নয়, বরং এটি হলো উচ্চতর কোনো সত্যকে পাওয়ার জন্য নিম্নতর আসক্তিকে ত্যাগ করা।
### ৪. বিশুদ্ধ ভক্তি ও স্থিতপ্রজ্ঞ অবস্থা
শ্লোকটির মূল শিক্ষা হলো—বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা বা ফল লাভের আশা ত্যাগ করে যখন বুদ্ধি কেবল পরমেশ্বরের দিকে নিবিষ্ট হয়, তখনই মানুষ প্রকৃত **ভক্তিযোগের** অধিকারী হয়। অর্থাৎ, ধর্ম তখন আর কেবল বইয়ের পড়া বা নিয়ম-কানুনের বিষয় থাকে না, তা হয়ে ওঠে অন্তরের গভীর উপলব্ধি।

0 মন্তব্যসমূহ